একজন নারীর স্বাধীনতা ও শরীর কোনো ধর্মীয় ফতোয়ায় নিয়ন্ত্রিত হওয়া অপ্রাসঙ্গিক। একজন মানুষের শরীর তার নিজের—কোনো ধর্ম, রাষ্ট্র বা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নয়। ইতিহাসে দেখা যায়, বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীর পোশাক, চলাফেরা, শিক্ষা, বিবাহ, মাতৃত্ব এবং যৌনজীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো বিশ্বাস বা মতাদর্শ যদি একজন নারীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার সীমিত করে, তবে সেটি মানবিক মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় ইসলামের ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অধর্মের পর্দার আড়ালে আছে। যেখানে উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও চরমপন্থাই শেষ কথা। ইসলামী শরিয়াহ আইন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামের অতীতের যে জাহেলিয়াতের ইতিহাস তা কখনোই একজন নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নে সম্মানজনক ছিলো না।
ইসলাম ধর্মের এ মৌলবাদীরা নারীর ক্ষমতায়ন চায় না। নারীদের চায় যৌনদাসী হিসেবে। যেখানে ইসলামের ইতিহাসে রয়েছে নাবালিকা শিশু থেকে শুরু করে নারী, তাদের প্রতি কিভাবে যৌন নিপীড়ন করা হত। ইসলাম ধর্মের দোহাই দিয়ে, কোরআনের আয়াত নাজিল করে বাধ্য করা হত নারীদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ইসলামের নামে তাদের প্রতি সে সম্প্রদায়ের মানুষদের লালায়িত হতে।
ইসলামের আইনের মাধ্যমে মুসলমানেরা বহু বিবাহের নামে নারীদের রক্ষিতার মত ব্যবহার করতো। যেখানে একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করার নিয়ম ছিলো ইসলামের আইনে বৈধ। স্বয়ং নবী মুহাম্মদ একাধিক স্ত্রী গ্রহণ করেছিলেন। যা একজন নারী হিসেবে আমার কাছে অবমাননাকর এবং সঠিক মনে হয়নি।
এবং এই অবিচারের পরম্পরা, ক্ষেত্র ও শিক্ষা নবী মুহাম্মদেরই প্রদর্শিত ধর্ম ইসলামের।
আজকের বাংলাদেশেও ইসলাম ধর্মের এ উম্মতেরা শরীয়াহ আইনের নামে নারীদের পঙ্গু করে পর্দায় আবৃত করে রাখতে চায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও বিএনপির এক এমপি মৌলবাদী গোষ্ঠী জামায়াতে ইসলামীর এক নারী এমপিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, বলেন, এরা কারা, এদের তো আমরা চিনি না, চিনতে পারি না।
বাধ্যতামূলকভাবে শুধুমাত্র ইসলামের নামে নারীদের পর্দার আড়ালে করে রাখা হয়েছে। এই মন্তব্যের প্রতিবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামপন্থী সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। কিন্তু বিএনপির এই সংসদ সদস্য যথার্থই বলেছেন।
নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা থাকবে। আমি কী পরব, কোথায় যাব, কীভাবে নিজেকে সাজিয়ে তুলব—এটি আমাদের একান্তই ব্যক্তিগত। কালো বোরখায় সমস্ত মুখ ঢাকা সেসব নারীদের ভূত-প্রেত বলেই মনে হচ্ছিল আপাতদৃষ্টিতে। এবং এসব পোশাক অবশ্যই সেসব নারীরা ধর্মের সেসব যৌনপীড়কদের জন্যই পরতে বাধ্য হয়েছেন। এ যেন এই কালো কাপড়ে ঢাকা ভুতুড়ে বাংলাদেশ।
এসব উগ্রবাদী ইসলামী জঙ্গিদের যদি সুযোগ থাকত, এরা আল্লাহকেও প্রশ্ন করত নারীদের পর্দাবৃত না করে কেন পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন? তাঁর ভুলের জন্য নারী আজ কতটা অনিরাপদ, যার জন্য শরীরে বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থাও রাখা একটি অপরাধে পরিণত হয়েছে!
একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কাকে বিয়ে করবেন, সন্তান নেবেন কি নেবেন না, কীভাবে জীবনযাপন করবেন—এসব সিদ্ধান্ত তার নিজের হওয়া উচিত। এবং যৌন স্বাধীনতাও একই ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কথিত ধর্ম ইসলাম পুরুষকে একাধিক স্ত্রী ও বেহেশতে ৭২ হুরের সাথে অবাধ যৌনতার অনুমোদন দিয়েছে। এটি দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তাঁর কোরআনের মাধ্যমে। যে কোরআন এ ধরণের কর্মের অনুমোদন দিতে পারে ইসলাম ধর্মের মাধ্যমে, সে ধর্ম কি করে স্রষ্ঠার ধর্ম হয়?
নারীদের ক্ষেত্রে এসব বৈষম্যের পেছনে ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক রীতি এবং পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি একসঙ্গে কাজ করে। তাই শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; প্রয়োজন এমন একটি ধর্মহীন সমাজ, যেখানে নারীর অধিকারকে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে বাধার সুযোগ থাকবে না।
কেউ ধর্ম পালন করতে চাইলে তা তার ব্যক্তিগত অধিকার, আবার কেউ ধর্মে বিশ্বাস না করলেও তার সমান মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আমার কাছে মানবতাবাদই সেই পথ, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে এবং সেই অধিকারই একটি সভ্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রকৃত ভিত্তি।
Post Comment